খেজুরের রস বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ
আব্দুল করিম চট্রগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
চট্রগ্রাম সীতাকুণ্ড - উপজেলার পূর্ব ভাটেরখীল গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিম। শীতের সকালে খেজুরের রসে ভেজা পিঠে-পুলি দিয়ে পরিবারবর্গের মুখে হাসি ফোটাতে চাওয়া গৃহিণীদের রসের জোগান দিতে প্রতিদিন সকাল-বিকাল তার সংগ্রাম চলছে। খেজুর গাছের রস বিক্রি করে এখনো জীবিকা নির্বাহ করছেন এমন মানুষের একজন সে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকু-ে খেজুরের রস দিন দিন কমছে। গ্রামের সড়কগুলোর সম্প্রসারণ, বহু ঘর-বাড়ি নির্মাণসহ নানা কারণে খেজুরের গাছ নির্মূল করা হলেও এই গাছটির কাঠের মূল্য কম হওয়ায় নতুন করে এ গাছ রোপণে গ্রামবাসীর আগ্রহ কম। এতে দিনদিন হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামের ঐতিহ্যময় সু-স্বাদু খেজুরের রসের ভা-ার। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সীতাকু-ে একসময় প্রচুর খেজুর গাছ ছিলো। কিন্তু গত তিন দশকে জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় এই গাছ যথেচ্ছভাবে নিধন করা হয়েছে। তাই এখন খেজুর গাছ একেবারেই কমে গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত উপজেলার সাগর উপকূলীয় এলাকা এবং পাহাড়ের পাদদেশে কমবেশি খেজুর গাছ চোখে পড়ে। উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী এলাকার প্রবীণ কৃষক মো. আইয়ুব আলী বলেন, আসলে খেজুর গাছের রসের কোন তুলনা হয় না। শীতে গরম রসে পিঠা-পুলি ভিজিয়ে খাবার মতো সুস্বাদু খাবার আর কি আছে? তিনি বলেন, আগের দিনে সকালে গ্রামের পথে পথে হাঁটলেই রসে ভেজা নানারকম খাবারের সুঘ্রাণ ভেসে আসত। কিন্তু এখন যেন সব হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও আমাদের এই গ্রামটি উপকূলে হওয়ায় এখানে কিছু খেজুর গাছ আমরা দেখতে পাই। এই গ্রামে এসে নিয়মিত খেজুরের রস সংগ্রহ ও বিক্রি করেন পার্শ্ববর্তী পূর্ব ভাটেরখীল গ্রামের বাসিন্দা মো. রেজাউল করিম ও মুহিন। রেজাউল করিম বলেন, খেজুরের গাছ কমে গেছে, কিন্তু রসের চাহিদা সেই আগের মতই আছে। তাই আমি শীত মৌসুমে বিভিন্ন জনের খেজুর গাছ চুক্তিভিত্তিক কিনে নিয়ে রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করি। তিনি বলেন, এই গুলিয়াখালী গ্রাম থেকে তিনি শতাধিক খেজুর গাছ কিনেছেন। প্রত্যেকটি ৩শ টাকা করে। এই মৌসুমে যতদিন রস থাকবে, তিনি গাছগুলো থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করবেন। রেজাউল প্রতি কেজি রস বিক্রি করেন ৪০ টাকা করে। এই হিসেবে দৈনিক ১৮শ থেকে ২ হাজার কিংবা তারও বেশি টাকার রস বিক্রি করেন গাছগুলো থেকে। প্রতিদিন বিকালে গাছে প্লাস্টিকের হাঁড়ি বসিয়ে যান। আর খুব ভোরে এসে হাঁড়িগুলোতে জমে থাকা রস নিয়ে যান। এভাবে গত প্রায় ২ যুগ ধরে গাছ ভাড়া নিয়ে রস বিক্রি করেন তিনি। একইভাবে রসের এখনো অনেক চাহিদার কথা জানান তার সাথে থাকা অপর গাছি মো. মুহীন। তিনিও প্রতিদিন সকালে এখান থেকে রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেই সংসার চালান। তারা বলেন, শুধুমাত্র গাছ কম হওয়ার কারণে রস বাইরে সরবরাহ করতে পারি না। গাছ বেশি থাকলে শহরেও পাঠাতে পারতাম। তাহলে শুধু গ্রামের মানুষ নয় শহরের মানুষগুলোও খেজুরের রসের সুস্বাদ পেয়ে খুশি হতো। সীতাকু- পৌরসদরের মহাদেবপুরের বাসিন্দা প্রবীণ বৃদ্ধ মো. আলী আজগর বলেন, আমাদের যুগে শীত আর খেজুরের রস ছিলো অভিন্ন আত্মা। শীতের প্রতিদিন খেজুরের রসে ভেজা পিঠে ছাড়া নাস্তাই করিনি। কিন্তু এখন দিনদিন সব যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। আমরাই আগের মতো রস দেখি না। হয়ত আমরা এখনো যা দেখছি ভবিষ্যত প্রজন্ম তাও দেখবে না। শুধু প্রবীণদের মুখে খেজুরের রস, গুড় ও নানান পিঠে-পুলির গল্প শুনেই বিস্মিত হবে- কিন্তু এ স্বাদ পাবে না! এদিকে খেজুরের গাছ বিলুপ্তির পথেÑ একথা স্বীকার করে সীতাকু- কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র নাথ বলেন, আসলে এই গাছটিকে কেউ মূল্যবান কাঠের গাছের মতো যতœ করেন না। একটি গাছ কেটে আর লাগান না। তাই এটি হারিয়ে যাচ্ছে। সবার এই গাছটিকে যতœ করা উচিত। আর তা হলেই শীতের সুমিষ্ট রসের ম ম ঘ্রাণে ভরে যাবে গ্রামগুলো।


0 coment rios: